সংস্কৃতি প্রতিবেদক
ঢাকা | প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২৩:২৫
শুরুর ব্যর্থতা পেছনে ফেলে একটিমাত্র গজলের হাত ধরে বদলে গিয়েছিল ইতিহাসের গতিপথ; অচেনা ‘আখতারি বাঈ ফৈজাবাদী’ হয়ে উঠেছিলেন হিন্দুস্তানি মার্গ ও সেমি-ক্লাসিক্যাল সংগীতের মুকুটহীন রানি বেগম আখতার। কলকাতার মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানির ঝুঁকি নেওয়ার সেই সাহসী সিদ্ধান্ত আজও ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতপ্রেমীদের কাছে এক অবিস্মরণীয় বাঁক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
রেকর্ডিং স্টুডিওর কর্মকর্তারা যখন নতুন কণ্ঠ নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত, তখন মেগাফোন রেকর্ডের কর্ণধার জিতেন্দ্রনাথ ঘোষ তরুণী আখতারির অনন্য কণ্ঠস্বরে খুঁজে পেয়েছিলেন অন্য এক সুরের আভা। সেই আস্থার প্রতিদান হিসেবেই ১৯৩০-এর দশকে বাজারে এল ‘দিওয়ানা বানানা হ্যায় তো দিওয়ানা বানা দে’। গানটি প্রকাশের পরপরই বদলে গেল সব সমীকরণ; চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল তাঁর গায়কির দ্যুতি।
পরবর্তী চার দশক ধরে গজল, দাদরা আর ঠুমরিকে আভিজাত্যের অন্দরমহল থেকে সাধারণ শ্রোতার ড্রয়িংরুমে পৌঁছে দেন তিনি। উর্দু গজলের গভীর বেদনা যেমন তাঁর কণ্ঠে মূর্ত হতো, তেমনি বাংলা আধুনিক ও শাস্ত্রীয় ধারার মেলবন্ধনে গাওয়া ‘জোছনা করেছে আড়ি’র মতো গানগুলো প্রমাণ করে ভাষার সীমানা পেরিয়ে অনুভূতির বিস্তার ঘটানোর দুর্লভ ক্ষমতা। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও সুরের সঙ্গ ছাড়েননি এই মল্লিকা-এ-গজল।
বেগম আখতারের সংগীতযাত্রাকে তুলে ধরা অবিস্মরণীয় ১০ গান:
- দিওয়ানা বানানা হ্যায় তো দিওয়ানা বানা দে: তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঐতিহাসিক গজল, যা তাঁকে রাতারাতি তারকাখ্যাতি এনে দেয়।
- জোছনা করেছে আড়ি: বাংলা সংগীতে তাঁর অবিস্মরণীয় স্বাক্ষর; পূর্ণিমার বিরহগাথা যেখানে পেয়েছে নিখুঁত শাস্ত্রীয় অলংকরণ।
- কোয়েলিয়া মত কর পুকার: দাদরা অঙ্গের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন, যা তাঁর মন্দ্র স্বরের গভীরতাকে ফুটিয়ে তোলে।
- উলোঝ গয়ে নয়নওয়া: ঠুমরির ধারায় অনন্য দখল ও সুরের সুক্ষ্ম কারুকাজের অনুপম উদাহরণ।
- আয়ে মহব্বত তেরে আনজাম পে রোনা আয়া: শাকিল বাদায়ুনির কলমে বিরহ ও আত্মদহনের সর্বকালের সেরা গজল রূপায়ণ।
- ওহ জো হম মে তুম মে কারার থা: মোমিন খাঁ মোমিনের অমর শায়েরিতে সুরের নিবিড় মায়ার বুনন।
- মেরে হামনফস মেরে হামনাওয়া: নিখাদ বন্ধুত্ব আর না-পাওয়ার হাহাকারে মোড়া ক্লাসিক গজল।
- ইয়ে না থি হামারি কিসমত: মির্জা গালিবের কবিতার গভীর দর্শনে কণ্ঠের নিখুঁত আবেগ।
- হামরি আতারিয়া পে আও: খাঁটি লখনউ ঘরানার ঠুমরি ও লোকসুর মিশ্রিত হৃদয়গ্রাহী পরিবেশনা।
- কুচ তো দুনিয়া কি ইনায়াত নে দিল তোড় দিয়া: জীবনের শেষ পর্বের অন্যতম মর্মস্পর্শী পরিবেশনা, যাতে জড়িয়ে ছিল তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের বিষাদ।
সংগীত গবেষকদের মতে, বেগম আখতার কেবল সুরের অনুশীলন করেননি, সুরের ভেতর দিয়ে যাপন করেছেন মানবজীবনের যন্ত্রণা ও আকুতি। শাস্ত্রীয় শৃঙ্খলার ভেতরে থেকেও আবেগের তীব্রতাকে অটুট রাখা ছিল তাঁর অনন্য বৈশিষ্ট্য। সুরের প্রতিটি মোচড়ে যে সূক্ষ্ম কারুকাজ তিনি তৈরি করতেন, তা অনুকরণ করা পরবর্তী প্রজন্মের বহু শিল্পীর জন্যই অসাধ্য এক সাধনা হয়ে থেকে গেছে।
আখতারি বাঈ থেকে বেগম আখতার হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ পথচলা ছিল একাধারে লড়াই ও আত্মোপলব্ধির আখ্যান। ‘দিওয়ানা’র সেই প্রথম উন্মাদনা থেকে শুরু করে ‘জোছনা’র মায়াবী নির্জনতা—তাঁর রেখে যাওয়া প্রতিটি সুরের বিস্তার আজও সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়কে দোলা দেয়, যা সময়ের ধূসরতাকে অগ্রাহ্য করে চিরসবুজ হয়ে বেঁচে থাকবে শতাব্দীর পর শতাব্দী।