আন্তর্জাতিক ডেস্ক
লন্ডন | প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬
যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ত্যাগের ঐতিহাসিক গণভোটে রাশিয়ার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের বিষয়টি এবার প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেল খোদ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে। ২০১৬ সালের আলোচিত ওই ব্রেক্সিট গণভোট নিয়ে লন্ডনের ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট থেকে আসা এই অকপট স্বীকারোক্তি আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ইউরোপীয় রাজনীতিতে এক বিশাল তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
জনপ্রিয় রাজনৈতিক পডকাস্ট ‘দ্য রেস্ট ইজ পলিটিক্স’-এ দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম জানিয়েছেন, সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি ২০১৬ সালের গণভোটে মস্কোর ভূমিকার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানতে চান। ব্রিটিশ গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা মহলের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করেই আমার প্রথম প্রশ্ন ছিল ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটে কি রাশিয়ার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ছিল? আর আমি যে উত্তরটি পেয়েছি তা অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ও পরিষ্কার: হ্যাঁ, সেখানে নিশ্চিতভাবেই রাশিয়ার সরাসরি হস্তক্ষেপ ছিল।’
বার্নহামের এই বক্তব্য ব্রিটিশ রাজনীতির প্রচলিত ইতিহাসকে এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। অতীতে কনজারভেটিভ পার্টির একাধিক সরকার এই হস্তক্ষেপের কার্যকর প্রমাণ নেই বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও এবারই প্রথম ক্ষমতাসীন কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি জনসমক্ষে নথিবদ্ধ করলেন। তবে গোয়েন্দা মূল্যায়নের গোপনীয়তার স্বার্থে রাশিয়া ঠিক কী উপায়ে এবং কতটা গভীরে এই প্রভাব বিস্তার করেছিল, তার খুঁটিনাটি বিস্তারিত প্রকাশ করেননি তিনি।
সাক্ষাৎকারে কেবল যুক্তরাজ্যের অতীতের ক্ষততেই সীমাবদ্ধ থাকেননি বার্নহাম; তিনি জার্মানি ও ফ্রান্সসহ সমগ্র ইউরোপের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য এক জোরালো সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। তাঁর মতে, পশ্চিমের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে বিভক্ত ও অস্থিতিশীল করতে মস্কো বর্তমানে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডেও একই ধরনের কূটকৌশল প্রয়োগ করছে। সম্প্রতি বার্লিন সফরে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্ৎসের সঙ্গে বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, উগ্র-ডানপন্থী দলগুলোকে গোপনে মদদ জোগানো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্যের বিস্তার ঘটিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করাই ক্রেমলিনের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।
প্রধান উল্লেখযোগ্য দিক ও পরিসংখ্যান:
- প্রথমবারের মতো সরকারি স্বীকৃতি: ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটে ক্রেমলিনের গোপন হস্তক্ষেপের বিষয়টি প্রথম ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করলেন অ্যান্ডি বার্নহাম।
- ডাউনিং স্ট্রিটের অনুসন্ধান: সরকার গঠনের পর গোয়েন্দা নথির ভিত্তিতে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট থেকে সুস্পষ্ট ইতিবাচক জবাব পাওয়ার দাবি।
- ইউরোপের প্রতি সতর্কবার্তা: একই ধরনের সাইবার ও অপতথ্য ছড়ানোর ফাঁদ বর্তমানে ফ্রান্স ও জার্মানির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও সক্রিয় রয়েছে বলে হুঁশিয়ারি।
- ইউরোপীয় ভূরাজনীতির সমীকরণ: ব্রিটিশ রাজনীতিতে ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃমূল্যায়ন এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজনে ব্লকে ফেরার পথ উন্মুক্ত রাখার আলোচনার পটভূমিতে এই মন্তব্য এলো।
বিশ্লেষকদের ধারণা, বার্নহামের এই স্বীকারোক্তি কেবল অতীতের একটি গণভোটের বৈধতা নিয়ে বিতর্ককে উসকে দেবে না, বরং ইউরোপের নিরাপত্তা নীতিতে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের ডাক দেবে। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা দেশগুলো তথ্যযুদ্ধ ও সাইবার আগ্রাসনের ক্ষেত্রে আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে থেকেছে বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ সম্পর্কে ভোটারদের কাছে যথেষ্ট তথ্য প্রকাশ না করায় পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলো বারবার ঝুঁকিতে পড়ছে।
ব্রেক্সিট কার্যকরের পর কেটে গেছে এক দশকেরও বেশি সময়, কিন্তু এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিঘাত এখনো যুক্তরাজ্যের সমাজে স্পষ্ট। এমন পরিস্থিতিতে খোদ প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে আসা এই সত্যোচ্চারণ প্রমাণ করে যে, ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে জাতীয় নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণে আধুনিক তথ্যযুদ্ধ আজ সামরিক কামানের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী এক অস্ত্র হয়ে উঠেছে।