স্পোর্টস ডেস্ক
বুয়েনস এইরেস | প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২৩:০০
আকাশী-সাদা জার্সিতে দুই দশকের অবিস্মরণীয় মহাকাব্যের শেষ দৃশ্যটি রচিত হলো ঘরের মাঠেই। বুয়েনস এইরেসে এক আবেগঘন রাতে বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের সহজ জয়ে আর্জেন্টিনার হয়ে নিজের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটি স্মরণীয় করে রাখলেন লিওনেল মেসি। পেনাল্টি থেকে করা এক গোল এবং আরও দুটি চোখধাঁধানো অ্যাসিস্টে ক্যারিয়ারের ২০৮তম ম্যাচে মাঠ ছাড়ার পর ৩৯ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি জানালেন, তিনি সম্পূর্ণ তৃপ্ত ও কৃতজ্ঞ।
স্তাদিও মনুমেন্তালে ম্যাচের আবহ যেন কেবল একটি প্রীতি ম্যাচের ছিল না; ছিল একটি রাজকীয় বিদায়ের মহোৎসব। পুরো স্টেডিয়ামজুড়ে লাখো ভক্তের চোখে জল আর করতালির মূর্ছনায় খেলা শুরুর বাঁশি বাজে। দ্বিতীয়ার্ধে ঠান্ডা মাথায় স্পট-কিক থেকে বল জালে জড়ানোর পর গ্যালারি থেকে ভেসে আসা ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনি ছুঁয়ে যায় আটবারের ব্যালন ডি’অর বিজয়ীকে। শুধু গোল নয়, সতীর্থদের দিয়ে করানো দুটি গোলও স্মরণ করিয়ে দেয়, কেন তিনি ফুটবলের চিরকালীন বরপুত্র।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে স্বভাবসুলভ শান্ত ভঙ্গিতে নিজের অনুভূতির কথা প্রকাশ করেন বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে মেসি বলেন, ‘আমি এই জার্সি, আমার দেশ এবং সমর্থকদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। পেছনে ফিরে তাকালে কোনো অপ্রাপ্তি বা হাহাকার চোখে পড়ে না। আজ আমি গর্বিত, আর সবচেয়ে বড় কথা—আমি আত্মিকভাবে শান্ত ও তৃপ্ত। যা কিছু চেয়েছি, তার চেয়েও ঢের বেশি পেয়েছি।’
২০০৫ সালে এক দুঃস্বপ্নের লাল কার্ড দিয়ে শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক পথচলা নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে রূপ নিয়েছিল রূপকথায়। কোপা আমেরিকা কিংবা ২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের পরম তৃপ্তি তাকে আন্তর্জাতিক ফুটবলের অনন্য শিখরে পৌঁছে দেয়। বয়সের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খেলার গতি কিছুটা কমলেও তার ক্ষুরধার ফুটবল মস্তিষ্কের প্রভাব শেষ ম্যাচেও ছিল অটুট।
শেষ অধ্যায়ের মূল পরিসংখ্যান ও উল্লেখযোগ্য দিক:
- ম্যাচের ফল: আর্জেন্টিনা ৩–০ বেনিন (আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ, বুয়েনস এইরেস)।
- মেসির ব্যক্তিগত অবদান: শেষ ম্যাচে ১টি গোল (পেনাল্টি থেকে) এবং ২টি চোখধাঁধানো অ্যাসিস্ট।
- আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দৈর্ঘ্য: দীর্ঘ ২১ বছরের যাত্রা; মোট ২০৮টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ।
- অর্জন ও উত্তরাধিকার: একটি বিশ্বকাপ শিরোপা, একাধিক কোপা আমেরিকা এবং আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও ম্যাচ খেলার রেকর্ড।
- ম্যাচ-পরবর্তী অনুভূতি: কোনো আক্ষেপ ছাড়াই বিদায় নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে নিজেকে ‘গর্বিত ও প্রশান্ত’ বলে আখ্যা।
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর সতীর্থরা তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে পুরো মাঠ প্রদক্ষিণ করেন। গ্যালারিতে তখন কান্নার রোল আর উৎসবের অদ্ভুত মেলবন্ধন। দলের কোচ এবং তরুণ সতীর্থরা শ্রদ্ধাভরে স্বীকার করেন, মেসির রেখে যাওয়া শূন্যতা কোনো দিন পূরণ হওয়ার নয়; তবে তার জয়ী মানসিকতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সবসময় অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবে।
একটি সোনালী অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো ঠিকই, তবে আর্জেন্টিনার ফুটবলের ইতিহাসে লিওনেল আন্দ্রেস মেসির নাম লেখা থাকবে সোনার হরফে। বুয়েনস এইরেসের এই বিদায়ী রাত ফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়ে দীর্ঘকাল অমলিন থাকবে এক পূর্ণতার গল্প হিসেবে।